Wellcome to National Portal
মেনু নির্বাচন করুন
Main Comtent Skiped

শিরোনাম
ঘটনাপুঞ্জ
ডাউনলোড

 


আপডেট: ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৬, ০১:০৮
প্রিন্ট সংস্করণ
 

ধান চাষে কাঙ্ক্ষিত লাভ না পেয়ে পাট চাষে ঝোঁকেন কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর উপজেলার কৃষকেরা। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে পাটও সোনালি গৌরব হারায়। বছরের পর বছর এভাবে চলার পর একপর্যায়ে কৃষিতেই আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন কিষান-কিষানিরা। এমন বাস্তবতায় তাঁরা কচু চাষ করে লাভের মুখ দেখতে শুরু করেন। তিন বছর ধরে কুলিয়ারচরের রামদি, সালুয়া ও গোবরিয়া-লক্ষ্মীপুর ইউনিয়নের বেশির ভাগ কৃষক কচু চাষ করে নিজেদের ভাগ্য বদলেছেন।

এই কচুর বেশি ভাগ চলে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে। উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম বলেন, এবার উপজেলায় প্রায় তিন হাজার বিঘা জমিতে কচুর চাষ হয়েছে। এর ৮০ শতাংশই হয়েছে সালুয়া, রামদি ও গোবরিয়া-লক্ষ্মীপুর ইউনিয়নে। এবার প্রায় ২৫ কোটি টাকার কচু বিক্রির আশা করছেন কৃষকেরা।

 

নেপথ্যের গল্প: উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কার্যালয় এই অঞ্চলের কৃষকদের জন্য নিয়ে এল ‘বিনা-৭ ধান’। এই ধান চাষ করে অন্য জাতের চেয়ে কম সময়ে মাত্র ১১০ দিনের মধ্যে ফলন পাওয়া যায়।

কচু চাষে সময় লাগে আট থেকে নয় মাস বিনা-৭ ধান চাষ করা হয় আগস্ট মাসে। আর কচু রোপণ করতে হয় নভেম্বরের মাঝামাঝি। ব্লক সুপারভাইজাররা বোঝাতে লাগলেন, বিনা-৭ ধান চাষ করে কচু ফলাতে পারলে সময়ের চমৎকার সমন্বয় হয় এবং লাভেরও সুযোগ সৃষ্টি হবে। যেসব কৃষক এই পরামর্শ গ্রহণ করে বিনা-৭ ধান ও কচু চাষ শুরু করলেন। এতে ব্যাপক লাভবান হতে লাগলেন তাঁরা। রাতারাতি ছড়িয়ে পড়ে সমন্বিত এই চাষ পদ্ধতির সাফল্যের কাহিনি।

উপজেলার সালুয়া ইউনিয়নের বীর কাশিমনগর ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা ফরিদ আহমেদ বলেন, যেখানে যা প্রয়োজন, সেই অনুযায়ী জাত উদ্ভাবন ও প্রয়োগ করা গেলে কৃষিতে সুদিন ফিরিয়ে আনা সম্ভব—এর উদাহরণ কুলিয়ারচর।

কচু চাষে বিপ্লব: সম্প্রতি তিন ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, বেশির ভাগ জমিতে কচু চাষ করা হয়েছে। এখন চলছে বিক্রি। ঢাকা থেকে পাইকারেরা এসে নিজ দায়িত্বে কচু তুলে তা ট্রাকে করে গন্তব্যে নিয়ে যাচ্ছেন। এরই মধ্যে উৎপাদিত কচুর ৭০ শতাংশ বিক্রি হয়ে গেছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

রামদি ইউনিয়নের মনোহরপুর গ্রাম জগৎচর ব্লকের অন্তর্ভুক্ত কৃষি এলাকা। কৃষি কার্যালয়ের তথ্যমতে, জগৎচর ব্লকে এবার ২ হাজার ২৪১ বিঘা জমিতে কচু চাষ হয়েছে। ওই গ্রামের কৃষক আবু বক্কর বয়সে তরুণ। তিনি এবার এক বিঘার কিছু কম জমিতে সাদা কচু চাষ করেছেন। সেই কচু বিক্রি হয়েছে ৪০ হাজার টাকার, আর লতা বিক্রি হয়েছে ১২ হাজার টাকার, গজানো চারা বিক্রি করা যাবে ৮ হাজার টাকার; বিভিন্ন ধরনের সার ৫ হাজার টাকা, চারা ৭০০ টাকা, রোপণ ও পরিচর্যা বাবদ খরচ হয়েছিল আরও ৪ হাজার টাকা। আবু বক্কর জানান, কচু ও চারা বিক্রির পুরো টাকাটাই তাঁর লাভ।

মনোহরপুর গ্রামের লায়েছ মিয়া দুই বিঘা জমির কালো কচু বিক্রি করেছেন ১ লাখ ২০ হাজার টাকায়। খরচ হয়েছে ৩৮ হাজার টাকা।

কুলিয়ারচরের কচু বিদেশে: শুধু দেশে নয়, বিদেশেও কদর বাড়ছে এই কচুর। রপ্তানিকারকদের কাছে কুলিয়ারচরের কচু বেশ পছন্দের। কারণ, এখানকার কচু আকারে লম্বা ও মোটা। বেশির ভাগ কচু যাচ্ছে এশিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে।

এ নিয়ে সালুয়া ব্লকে কথা হয় হারিছ মিয়া (৪৫) নামের এক পাইকারের সঙ্গে। তিনি কচু কেনেন বিদেশে পাঠানোর জন্য। হারিছ মিয়া বলেন, এবার তিনি ১৫ বিঘা জমির কচু কিনে প্রায় পুরোটাই রপ্তানিকারকদের কাছে বিক্রি করছেন।

হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের উদ্ভিদ সংগনিরোধ কেন্দ্রের উপপরিচালক হাফিজুর রহমান বলেন, চলতি বছরে এখন পর্যন্ত লতা, শাকসহ কচু রপ্তানির পরিমাণ ২ হাজার ৫৮৮ মেট্রিক টন। এই কচুর বড় অংশ এসেছে কুলিয়ারচর থেকে।

পরিবহনসুবিধা: এই তিন ইউনিয়নের পাশ ঘেঁষে গেছে ভৈরব-ময়মনসিংহ আঞ্চলিক মহাসড়ক। এই মহাসড়ক ভৈরবে গিয়ে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। ফলে ঢাকা থেকে যেকোনো সময় খুব সহজে আড়াই ঘণ্টার মধ্যে কুলিয়ারচরে ট্রাক নিয়ে আসা যায়। আবার মহাসড়কের পাশে ট্রাক রেখে কচু বোঝাই করে সহজে গন্তব্যে পৌঁছা যায়। ট্রাকভাড়া পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকা। পাইকারেরা আগে এসে জমির ফলন কিনে রেখে যান। পরে এসে নিজ দায়িত্বে কচু তুলে নিয়ে যান।

কচুর এত গুণ!: কুলিয়ারচরে দুই ধরনের কচু চাষ হয়—সাদা ও কালো কচু। কালো কচু স্থানীয়ভাবে নারকেল কচু হিসেবে পরিচিত। সাদা কচুতে তুলনামূলক লতা বেশি হয়। তবে সবজি হিসেবে দুই ধরনের কচুই ভালো। এতে নানা পুষ্টিগুণ রয়েছে।

ঢাকার বারডেম জেনারেল হাসপাতালের প্রধান পুষ্টিবিদ আখতারুন নাহার বলেন, কচুর আগাগোড়ায় অধিক পুষ্টিগুণ বিদ্যমান। মানুষের শরীর গঠনে ভালো ভূমিকা রাখে কচু। বিশেষ করে অন্তঃসত্ত্বা নারীদের জন্য কচুশাক খাওয়া খুবই জরুরি। কচুশাককে ব্লাড ব্যাংক বলা যায়। রক্তস্বল্পতা দূর করার জন্য কচুশাক অত্যন্ত উপকারী। তবে সবুজ কচুর চেয়ে কালো কচুতে পুষ্টিগুণ বেশি। কচুর লতায়ও সমান পুষ্টিগুণ রয়েছে। এই খাবার মানুষের শরীরের ওজন বাড়তে দেয় না।

আখতারুন নাহার বলেন, একসময় কচুকে গরিবের খাবার ভাবা হতো। কিন্তু এখন সবাই বুঝতে পারছে, কচু গরিবের নয়, সবারই খাবার।


আপডেট: ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৬, ০১:০৮
প্রিন্ট সংস্করণ
 

ধান চাষে কাঙ্ক্ষিত লাভ না পেয়ে পাট চাষে ঝোঁকেন কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর উপজেলার কৃষকেরা। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে পাটও সোনালি গৌরব হারায়। বছরের পর বছর এভাবে চলার পর একপর্যায়ে কৃষিতেই আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন কিষান-কিষানিরা। এমন বাস্তবতায় তাঁরা কচু চাষ করে লাভের মুখ দেখতে শুরু করেন। তিন বছর ধরে কুলিয়ারচরের রামদি, সালুয়া ও গোবরিয়া-লক্ষ্মীপুর ইউনিয়নের বেশির ভাগ কৃষক কচু চাষ করে নিজেদের ভাগ্য বদলেছেন।

এই কচুর বেশি ভাগ চলে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে। উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম বলেন, এবার উপজেলায় প্রায় তিন হাজার বিঘা জমিতে কচুর চাষ হয়েছে। এর ৮০ শতাংশই হয়েছে সালুয়া, রামদি ও গোবরিয়া-লক্ষ্মীপুর ইউনিয়নে। এবার প্রায় ২৫ কোটি টাকার কচু বিক্রির আশা করছেন কৃষকেরা।

 

নেপথ্যের গল্প: উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কার্যালয় এই অঞ্চলের কৃষকদের জন্য নিয়ে এল ‘বিনা-৭ ধান’। এই ধান চাষ করে অন্য জাতের চেয়ে কম সময়ে মাত্র ১১০ দিনের মধ্যে ফলন পাওয়া যায়।

কচু চাষে সময় লাগে আট থেকে নয় মাস বিনা-৭ ধান চাষ করা হয় আগস্ট মাসে। আর কচু রোপণ করতে হয় নভেম্বরের মাঝামাঝি। ব্লক সুপারভাইজাররা বোঝাতে লাগলেন, বিনা-৭ ধান চাষ করে কচু ফলাতে পারলে সময়ের চমৎকার সমন্বয় হয় এবং লাভেরও সুযোগ সৃষ্টি হবে। যেসব কৃষক এই পরামর্শ গ্রহণ করে বিনা-৭ ধান ও কচু চাষ শুরু করলেন। এতে ব্যাপক লাভবান হতে লাগলেন তাঁরা। রাতারাতি ছড়িয়ে পড়ে সমন্বিত এই চাষ পদ্ধতির সাফল্যের কাহিনি।

উপজেলার সালুয়া ইউনিয়নের বীর কাশিমনগর ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা ফরিদ আহমেদ বলেন, যেখানে যা প্রয়োজন, সেই অনুযায়ী জাত উদ্ভাবন ও প্রয়োগ করা গেলে কৃষিতে সুদিন ফিরিয়ে আনা সম্ভব—এর উদাহরণ কুলিয়ারচর।

কচু চাষে বিপ্লব: সম্প্রতি তিন ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, বেশির ভাগ জমিতে কচু চাষ করা হয়েছে। এখন চলছে বিক্রি। ঢাকা থেকে পাইকারেরা এসে নিজ দায়িত্বে কচু তুলে তা ট্রাকে করে গন্তব্যে নিয়ে যাচ্ছেন। এরই মধ্যে উৎপাদিত কচুর ৭০ শতাংশ বিক্রি হয়ে গেছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

রামদি ইউনিয়নের মনোহরপুর গ্রাম জগৎচর ব্লকের অন্তর্ভুক্ত কৃষি এলাকা। কৃষি কার্যালয়ের তথ্যমতে, জগৎচর ব্লকে এবার ২ হাজার ২৪১ বিঘা জমিতে কচু চাষ হয়েছে। ওই গ্রামের কৃষক আবু বক্কর বয়সে তরুণ। তিনি এবার এক বিঘার কিছু কম জমিতে সাদা কচু চাষ করেছেন। সেই কচু বিক্রি হয়েছে ৪০ হাজার টাকার, আর লতা বিক্রি হয়েছে ১২ হাজার টাকার, গজানো চারা বিক্রি করা যাবে ৮ হাজার টাকার; বিভিন্ন ধরনের সার ৫ হাজার টাকা, চারা ৭০০ টাকা, রোপণ ও পরিচর্যা বাবদ খরচ হয়েছিল আরও ৪ হাজার টাকা। আবু বক্কর জানান, কচু ও চারা বিক্রির পুরো টাকাটাই তাঁর লাভ।

মনোহরপুর গ্রামের লায়েছ মিয়া দুই বিঘা জমির কালো কচু বিক্রি করেছেন ১ লাখ ২০ হাজার টাকায়। খরচ হয়েছে ৩৮ হাজার টাকা।

কুলিয়ারচরের কচু বিদেশে: শুধু দেশে নয়, বিদেশেও কদর বাড়ছে এই কচুর। রপ্তানিকারকদের কাছে কুলিয়ারচরের কচু বেশ পছন্দের। কারণ, এখানকার কচু আকারে লম্বা ও মোটা। বেশির ভাগ কচু যাচ্ছে এশিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে।

এ নিয়ে সালুয়া ব্লকে কথা হয় হারিছ মিয়া (৪৫) নামের এক পাইকারের সঙ্গে। তিনি কচু কেনেন বিদেশে পাঠানোর জন্য। হারিছ মিয়া বলেন, এবার তিনি ১৫ বিঘা জমির কচু কিনে প্রায় পুরোটাই রপ্তানিকারকদের কাছে বিক্রি করছেন।

হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের উদ্ভিদ সংগনিরোধ কেন্দ্রের উপপরিচালক হাফিজুর রহমান বলেন, চলতি বছরে এখন পর্যন্ত লতা, শাকসহ কচু রপ্তানির পরিমাণ ২ হাজার ৫৮৮ মেট্রিক টন। এই কচুর বড় অংশ এসেছে কুলিয়ারচর থেকে।

পরিবহনসুবিধা: এই তিন ইউনিয়নের পাশ ঘেঁষে গেছে ভৈরব-ময়মনসিংহ আঞ্চলিক মহাসড়ক। এই মহাসড়ক ভৈরবে গিয়ে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। ফলে ঢাকা থেকে যেকোনো সময় খুব সহজে আড়াই ঘণ্টার মধ্যে কুলিয়ারচরে ট্রাক নিয়ে আসা যায়। আবার মহাসড়কের পাশে ট্রাক রেখে কচু বোঝাই করে সহজে গন্তব্যে পৌঁছা যায়। ট্রাকভাড়া পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকা। পাইকারেরা আগে এসে জমির ফলন কিনে রেখে যান। পরে এসে নিজ দায়িত্বে কচু তুলে নিয়ে যান।

কচুর এত গুণ!: কুলিয়ারচরে দুই ধরনের কচু চাষ হয়—সাদা ও কালো কচু। কালো কচু স্থানীয়ভাবে নারকেল কচু হিসেবে পরিচিত। সাদা কচুতে তুলনামূলক লতা বেশি হয়। তবে সবজি হিসেবে দুই ধরনের কচুই ভালো। এতে নানা পুষ্টিগুণ রয়েছে।

ঢাকার বারডেম জেনারেল হাসপাতালের প্রধান পুষ্টিবিদ আখতারুন নাহার বলেন, কচুর আগাগোড়ায় অধিক পুষ্টিগুণ বিদ্যমান। মানুষের শরীর গঠনে ভালো ভূমিকা রাখে কচু। বিশেষ করে অন্তঃসত্ত্বা নারীদের জন্য কচুশাক খাওয়া খুবই জরুরি। কচুশাককে ব্লাড ব্যাংক বলা যায়। রক্তস্বল্পতা দূর করার জন্য কচুশাক অত্যন্ত উপকারী। তবে সবুজ কচুর চেয়ে কালো কচুতে পুষ্টিগুণ বেশি। কচুর লতায়ও সমান পুষ্টিগুণ রয়েছে। এই খাবার মানুষের শরীরের ওজন বাড়তে দেয় না।

আখতারুন নাহার বলেন, একসময় কচুকে গরিবের খাবার ভাবা হতো। কিন্তু এখন সবাই বুঝতে পারছে, কচু গরিবের নয়, সবারই খাবার।